Pages

Sunday, 26 July 2026

জয়তু নতুন প্রজন্ম

যা পেলাম  তা দুর্লভ

কৃশাণু মিত্র



কী পাইনি তার হিসাব আজ মেলাব না। ককরোচ আন্দোলন এই দিশাহারা সময়কে অনেক কিছু দিয়েছে। তাই বরং কী কী পাওয়া গেল, তা খতিয়ে দেখি।

১) নতুন সময়ের নেতৃত্ব

আমরা তথাকথিত সবজান্তারা আলোচনা সভায়, মিছিলে, গণসংগঠনে যাদের মুখ দেখি, তাদের বাইরেও যে লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতী রয়েছে, তা নতুন করে উপলব্ধি করলাম। আমরা ভেবেছিলাম, সমাজের দায়িত্ব বোধহয় কেবল আমাদেরই। আর ওরা? ওরা নাকি মোবাইল-কম্পিউটারে আসক্ত! অথচ প্রযুক্তির ব্যবহার করে আন্দোলনের ডাক দেওয়া, গোদি মিডিয়াকে ছাপিয়ে ও আইটি সেলের প্রোপাগান্ডাকে কার্যত গুনতিতে নস্যাৎ করে ভারতবাসীর মন জয় করে নেওয়ার কাজ তারাই করে দেখাল।

২) পেলাম লক্ষ লক্ষ সাংবাদিক

যারা স্পনসর্ড গোদি মিডিয়াকে গণতান্ত্রিক পথেই বাণপ্রস্থে পাঠিয়ে দিতে পারে। গোদি মিডিয়া যখন কদর্য ভাষ্যে সমাজে বপন করছে কূট বিষ, তখন এই লক্ষ লক্ষ তরুণ তাদের মোবাইলে, কম্পিউটারে নির্মাণ করছে রিল, মিম আর নবতর ভাষ্য ও স্বপ্ন। এরাই প্রকৃত সাংবাদিক ও মিডিয়া।

৩) শিখলাম সাংস্কৃতিক লড়াই

মজে যাওয়া খাত ভরে উঠল নতুন প্লাবনে। বিহার ও যন্তর মন্তরের ব্যঙ্গাত্মক গান আজ মনের মণিকোঠায় হিল্লোল তোলে। রঙ্গ-তামাশাও যে প্রতিবাদের পথ হতে পারে, তা আমরা ভাবিনি। যখন কোনও পড়ুয়া পুলিশকে গিয়ে বলে, 'আমায় ডান্ডা মারো', তখন বিশ্বের মানুষের বুক রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। 'দেওয়ালে দেওয়ালে' নয়, প্রযুক্তির হাত ধরে সবুজের বার্তা পৌঁছে যায় আপামর জনসাধারণের ঘরে ঘরে। মিম, কার্টুন, কবিতা, রিল— নিরন্তর তৈরি হতে থাকে চ্যাটজিপিটির সঙ্গে নিজের সৃজনশীল সত্তাকে মিলিয়ে। যাকে বয়স্করা সর্বনাশ বলে চিহ্নিত করেছিলেন, নবীনরা তাকেই প্রতিবাদের মাধ্যম করে তুলল। রাষ্ট্রকে নিয়ে এমন মশকরা আমরা কস্মিনকালেও দেখিনি। আমরা জানতাম, রাষ্ট্র মানেই লেফট-রাইট; তার সঙ্গে যুদ্ধ মানেই 'লেফ্টিও রাইট' (আমার কাছে যার অর্থ, বামেদের বহু ব্যবহৃত অথচ বিফল পথ)। ইংল্যান্ড প্রবাসী এক পুত্র মুম্বই থেকে তার বাবা-মাকে যন্তর মন্তরে পাঠিয়েছে এই বলে— 'বাবা, তুমি আমার হয়ে পুলিশের কাছে একটা ডান্ডা খেয়ে এসো।'

৪) ঘুচে গেল নারী-পুরুষের বিভেদ

অগণিত তরুণ-তরুণীর সমাবেশ যেখানে নারীশক্তির কাছে ভয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারত, সেখানে নারীরা ছিলেন নির্ভয়। কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলেও তার কারণ রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারীদের মানসিকতা, নাগরিক ও GenZ জমায়েত নয়— এমন উপলব্ধিও সামনে এসেছে। প্রতিবাদ আর নারীমুক্তি পাশাপাশি হেঁটেছে। মেয়েরা কেবল সংসার করবে, লেখাপড়া করবে না— এই মনুবাদী, তালিবানী রাষ্ট্র-ন্যারেটিভ সাংস্কৃতিক প্রতিবাদের আগ্রাসনে ভেঙে পড়েছে। কন্যাসমা একজন যখন হাতে স্যানিটারি ন্যাপকিনের প্যাকেট নিয়ে বলে, 'পরীক্ষার প্রশ্নপত্র লিক করে, আমার ন্যাপকিন নয়', তখন পরিবারের মনুবাদী একনায়কত্ব খানখান হয়ে যায়। আমি এই প্রজন্মকে, এই কন্যাকে প্রণাম করি। এই প্রজন্ম পরিবারের ভীত-সন্ত্রস্ত জ্যেষ্ঠদেরও শিক্ষা দিতে পেরেছে।

৫) ধর্ম যখন ভাই-ভাই 

জুনেইদ ভাই ও তাঁর সঙ্গীরা দেখিয়েছেন কাকে বলে মানবধর্মী উৎসব। ককরোচদের ধর্ম নিরপেক্ষ মানসিকতা ও শিখ সম্প্রদায়ের পাগড়ি দান রবীন্দ্রনাথের ‘মহামানবের সাগরতীরে’ যেন ভারতবাসীকে হাজির করেছে। গরু-গোবর, হনুমান কিংবা হিন্দুত্ববাদী বহু ন্যারেটিভ মুহূর্তেই খসে পড়েছে। এক প্রতিবাদী জনৈক RAF জওয়ানকে বলছে, 'আমি পাকিস্তানি, আমাকে গুলি করো।' ভোটের রাজনীতির জন্য রাষ্ট্র যে সব উপাদানকে ব্যবহার করেছে, পড়ুয়ারা তা ওলটপালট করে দিয়েছে। রাষ্ট্রকে এখন নতুন করে ভাবতে হবে।

৬) মেটামরফোসিস

'আরশোলারা কি এক জায়গায় হতে পারে না?' অভিজিৎ দিপকে'র এই আকাঙ্ক্ষা থেকে ককরোচদের যে উত্থান এবং অভিজিতের দেশে ফিরে আসা, যেন কাফকার 'মেটামরফোসিস'। সোনম ওয়াংচুক যেন পেট্রোল চালিত ইঞ্জিনের স্পার্ক প্লাগ। 'তুমি যে সুরের আগুন লাগিয়ে দিলে…'— জ্বলে উঠল আকাশ-বাতাস, গান্ধীর পথে। যেখানে বস্তু পোড়ে না, পোড়ে প্রতিটি মানুষের মন। আত্মদহন পরশমণি হয়ে ভুল-ঠিক চেনার পথ দেখিয়ে দেয়।

৭) আন্দোলনের পথ

আন্দোলনের ধারার যে পরিচিত রূপ দেখা যায়— ধরা যাক জঙ্গলের লড়াই— সেখানে কত বীর শহিদ হয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। যদি ভগৎ সিং কিংবা তাঁর সমসাময়িক স্বাধীনতাকামী বিপ্লবীদের কথাও ভাবি (যদিও সেই যুগে মিডিয়া আজকের মতো সর্বব্যাপী ছিল না), তাহলে দেখব, অনশন এমন একটি পথ যা বিপথগামী সমাজ মানসে আত্মদহনের কাজ করে। ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের অবস্থান পরিবর্তন করে অনশন। এই পর্যায়টি আদতে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, যা মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। যে বাচ্চারা অনশনে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের প্রণাম করে বলি—

'জয়তু নতুন প্রজন্ম। অনেক শেখালে।'


14 comments:

  1. খুব ভালো মূল্যায়ন। নব দিগন্ত উন্মোচিত হলো।

    ReplyDelete

  2. [26/07, 9:02 pm] Saibal Biswas:-: খুবই ভালো বিশ্লেষণ সহযোগে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন।

    ReplyDelete

  3. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রক্তকরবী নাটকে খোদাই-নৃত্য ছিল এক প্রতীকী ও প্রাণের প্রকাশ, যেখানে যক্ষপুরীর শৃঙ্খলিত শ্রমিকদের যান্ত্রিক খাটুনিকে আনন্দে রূপান্তরিত করে নায়ক রঞ্জন। নাটকের ২৪ সংখ্যক অংশে রঞ্জনের প্রেরণায় এই নৃত্যের ধারণাটি আসে।
    ১) মাদলের বিকল্প কোদাল: যক্ষপুরীতে যখন শ্রমিকরা জিজ্ঞাসা করে মাদল কোথায় পাবে, তখন রঞ্জন বলে যে মাদল না থাকলে কোদালই মাদল।
    ২) কাজের রশি মুক্ত করা: কোদালের তালে তালে মাটি ও সোনার পিণ্ড নিয়ে শুরু হয় লোফালুফি। রঞ্জন ঘোষণা করে যে কাজের রশি টেনে চালাতে হবে না, তা এবার নেচে চলবে।
    ৩) যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রাণ: কঠিন ও শোষিত খনি জীবনের ক্লান্তি মুছে ফেলে আনন্দ ও মানবসত্তার জয়গান গাওয়াই এই খোদাই-নৃত্যের মূল সুর।
    মনে পড়ছে সলিল চৌধুরীর গানের সেই লাইন -- "শিকল চরণে তার হয়েছে নুপুর"।

    ReplyDelete
    Replies
    1. অজান্তে রবীন্দ্রভাব প্রকট ছিল প্রজন্মের চেতনায়।

      Delete
  4. ভারতীয় আন্দোলনের ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা সংযোজিত হল। ভারতব্যাপী ছড়িয়ে পড়লেও আন্দোলন ছিল সংযত , দৃঢ় ও অনেকটাই শৃঙ্খলাবদ্ধ। শশাসক ভয় পেল। আন্দোলনের এর থেকে বড় প্রাপ্তি কি হতে পারে। ভালো লেখা।

    ReplyDelete
  5. সঠিক শব্দচয়ন করে সঠিক বিশ্লেষণ।

    ReplyDelete
  6. লেখাটির মধ্যে দিয়ে বর্তমান সময়ের মর্মস্পর্শী ছবি প্রস্ফুটিত হয়েছে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. আমাদের ভাবনা ছড়াতে হবে। আমরা যে বদলাতে জানি সেই সিদ্ধান্ত নবীন প্রজন্ম জানুক। ওরা বুঝুক আমরা ওদের বুঝতে চাই।
      জয় নতুন ভারত।

      Delete
  7. তোমার সাথে একমত দাদা, তবে তুমি ভাব প্রকাশ দারুন ভাবে করেছো ।

    ReplyDelete
  8. নতুন সময়ে দিশাহীনতার দম- বন্ধ- করা অবস্থায় এলো যেন এক বুক বাতাস।আর আলোতে উদ্ভাসিত হল প্রাণচঞ্চল বিদ্রোহ। তরুণ- তরুণীরা আমাদের পথ দেখিয়ে এগিয়ে চলেছে দিল্লীর যন্তর- মন্তরের রাজপথ জুড়ে।অনুপ্রাণিত হলাম নতুন প্রজন্মের কাছে ।আলোকিত হলাম লেখকের মর্মস্পর্শী লেখায়।

    ReplyDelete
  9. সহমত পোষণ করলাম। দারুণ বিশ্লেষণ।

    ReplyDelete
  10. আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে এই আন্দোলনকে সঠিক ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে , সতঃস্ফূর্ত আন্দোলন কিন্তু কোথাও বিপথগামী নাহওয়া এটাই বোধহয় এই আন্দোলনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি ।
    আপনার লেখনির আমি বরাবরই গুণমুগ্ধ। তবে এটা যেন বড্ড ভাল হয়েছে ।

    ReplyDelete
  11. প্যারাসাইট বলে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়ার সর্চাবোচ্চ প্রয়াস কখনোই যুবছাত্রদের প্রশ্ন তোলার অধিকার কেড়ে নিতে পারে না, তার ব্যাবহারিক উদাহরণ এই আন্দোলন,আর দখিণা হাওয়ায় যখন বসন্ত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় তখন তাকে প্রতিহত করে গোলাপ ফোটায় সেই বামপন্থা। লেফট ইস অলোয়েজ রাইট সেখানে কোন শক্তি প্রতিহত করবে এই অজেয় শক্তি কে।
    কৃশানু দা দারুন লেখা

    ReplyDelete