Pages

Monday, 9 February 2026

বাণিজ্য লেনদেনের অজানা পরিণতি?

'সব চুক্তির সেরা' না 'সব বোঝার ভার'?

কৌশিকী ব্যানার্জী



সাম্প্রতিককালে ‘ট্রাম্প-ট্যারিফ’/ ‘শুল্কবাণ’ এই শব্দগুলো আমজনতার কাছে অতি পরিচিত। ২০২৫ সালে ধাপে ধাপে আমেরিকায় আমদানিকৃত ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ, তারপর গত ২ ফেব্রুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমাজ মাধ্যমে ইন্দো-মার্কিন নতুন বাণিজ্য চুক্তি ঘোষণা (যেখানে ভারতের পণ্যের ওপর শুল্ক কমে ১৮ শতাংশ করার কথা বলা হয়) নাটকীয়তার চূড়ান্ত প্রদর্শন বলে অনেকেরই অভিমত। অবশ্য, ৬ ফেব্রুয়ারি দু-দেশ যৌথ বিবৃতি দিয়ে এই ঘোষণাকে সিলমোহর দিয়েছে। তবে এখনও চুক্তি স্বাক্ষরিত না হলেও এই চুক্তিকে ‘father of all deals’ (বা, 'সব চুক্তির সেরা') বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে; যদিও বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধির মতো দৈনন্দিন সমস্যায় জর্জরিত ভারতবাসীর কাছে এসব নিয়ে মাথাব্যথার সময় কম। তবুও বলতে হয়, এই ভারত-মার্কিন দ্বৈরথের প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনে সুদূরপ্রসারী।

আমরা জানি, বাড়তি শুল্কের ফলে আমদানিকারী দেশের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পায় ঠিকই তবে মূলত আমদানি প্রতিস্থাপন কৌশল হিসেবে এটি আরোপিত হয় যাতে অভ্যন্তরীণ বাজারে আমদানিকৃত পণ্যের তুলনায় দেশীয় পণ্যের প্রসারে সুবিধা হয়। বলাই বাহুল্য, এটি মুক্ত বাণিজ্যে বাধাস্বরূপ কিন্তু আমদানিকারী দেশে আমদানি পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে তোলায় দেশের ভোক্তাদের উদ্বৃত্ত হ্রাস পায়, যেহেতু তাদের আগের থেকে বেশি দাম গুনতে হয়। ফলত, এটি মৃত-ভার ক্ষতি (অর্থাৎ, যখন অতিরিক্ত ক্ষতি বা বোঝা শুল্ক থেকে সংগৃহীত মূল্যের চেয়ে বেশি হয়) বাড়িয়ে তোলে। অতীতের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, ১৯৩০-এর দশকে মহামন্দার সময়ে বিভিন্ন দেশ আমদানি-শুল্ক আরোপ করলে সর্বত্র বাণিজ্য-বাধা বেড়ে যায় যা প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে একটি দুষ্টচক্রের জন্ম দেয়, যার অবসান হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। পরে শুল্কের বোঝা বিভিন্ন দেশ কমাতে থাকে ও বহুপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। শুল্ক ও বাণিজ্য সংক্রান্ত সাধারণ চুক্তি (গ্যাট) এবং পরবর্তীতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) মুক্ত-বাণিজ্য চুক্তির (FTA) প্রসারে সদর্থক ভূমিকা পালন করে। যদিও বিগত দশকে বেশির ভাগ দেশ আবার সংরক্ষণবাদী নীতি অনুসরণ করছে এবং দ্বিপাক্ষিক-চুক্তির প্রবণতা দেখা দিয়েছে।   

এমতাবস্থায় ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে মসনদে বসার দিন থেকেই বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর শুল্ক চাপিয়েছেন। মেক্সিকো, কানাডা, চীনের ওপর শুল্ক আরোপ এবং চীনের সঙ্গে শুল্ক-যুদ্ধ বিশ্ব বাণিজ্যে ঋণাত্মক প্রভাব ফেলেছে। গোটা বিশ্বকে ‘Buy American’ নীতি অনুসরণ করাতে চাইছেন তিনি। এতে আমেরিকায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ভোক্তাদের দেশীয় আমেরিকান পণ্য কিনতে উৎসাহিত করা, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্য ঘাটতির (যখন আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য রফতানির চেয়ে অধিক হয়) পরিমাণ হ্রাস এবং সর্বোপরি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরির কথা বলা হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, কখনও কখনও এই শুল্ককে তিনি হাতিয়ার করছেন চোরাচালান বা অনথিভুক্ত অভিবাসন রুখতে। এর ফলে, জেপি-মরগানের বিশ্লেষকরা অনুমান করেছেন যে, এই শুল্কনীতি ঘরে-বাইরে তীব্র অনিশ্চয়তা সৃষ্টি, শেয়ার বাজারে পতন, এমনকি ১৯৭০-র দশকের Stagflation বা নিশ্চলতা-স্ফীতির (যেখানে  স্তিমিত অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ও উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির সহাবস্থান) সম্ভাবনাকেও প্রকট করেছে। 

পাশাপাশি, ‘ট্রাম্প-নীতি’ ভারত-আমেরিকার বৈদেশিক বাণিজ্যেও সমূহ প্রভাব ফেলেছে। মূলত, রাশিয়া থেকে সুলভে তেল কেনা ও ইউক্রেন যুদ্ধে পরোক্ষ মদত দেবার অজুহাতে আমেরিকা গত ২৭ অগস্ট ২০২৫-এ ভারতীয় পণ্যের ওপর ধাপে ধাপে ৫০ শতাংশ শুল্ক (১০ শতাংশ বেসলাইন-শুল্ক + ১৫ শতাংশ পারস্পরিক-শুল্ক বা ‘রেসিপ্রোকাল-ট্যারিফ’ + ২৫ শতাংশ শাস্তিমূলক-শুল্ক) ধার্য করে, যা এ পর্যন্ত ছিল ভারতের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ হার। এইভাবে শক্তি প্রদর্শন করে ভারতকে বৈদেশিক বাণিজ্যে কোণঠাসা করতে চাওয়ার উদ্দেশ্য স্পষ্ট। কিন্তু, সংবাদসংস্থা PTI-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অর্থনীতিবিদ রঘুরাম রাজন বলেন, স্বল্পমেয়াদে এটি সর্বাগ্রে মার্কিন অর্থনীতির উপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। তাঁর মতে, ভারতের রফতানির ওপর এই শুল্কের প্রত্যক্ষ ফল হবে মার্কিন ভোক্তাদের জন্য দাম বৃদ্ধি, যা ভারতীয় পণ্যের চাহিদা কমাবে এবং ফলস্বরূপ দীর্ঘমেয়াদে ভারতের বৃদ্ধিও হ্রাস পাবে। দীর্ঘমেয়াদে কারণ, যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য দেশের ওপরও শুল্ক আরোপ করেছে ফলে ভারতের উপর সামগ্রিক প্রভাব ততটা তীব্র হবে না, যতটা হতে পারত যদি শুল্ক শুধু ভারতের ওপরই আরোপ করা হত। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ বরং ভারতের সামনে অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গে 'স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ক' ঝালিয়ে নেওয়ার রাস্তা খুলে দিয়েছে। ফলস্বরূপ, দীর্ঘ দু' দশক পরে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের সফল মুক্ত বাণিজ্য, এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, ফিনল্যান্ড, সাউথ এশিয়া, সংযুক্ত আরব আমির শাহীর সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিও ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত, চীন থেকে মোট আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধির সম্ভাবনাও প্রশস্ত।

অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের প্রধান রফতানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে ফার্মাসিউটিক্যালস, মূল্যবান পাথর ও গয়না, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও যান্ত্রিক সরঞ্জাম। ২০২৪ সালে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১২৯.২ বিলিয়ন USD থাকলেও ৫০ শতাংশ শুল্ক বৃদ্ধিতে বস্ত্র, গহনা, চামড়াজাত দ্রব্য, গাড়ির যন্ত্রাংশ - এই শিল্পগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি, ভারতীয় মুদ্রার ক্রম-অবমূল্যায়ন (যা গত মাসে ৯২ টাকা প্রতি USD দাঁড়ায়) ও শেয়ার বাজারের অস্থিরতার কারণে বিদেশি বিনিয়োগ ও মূলধনের বহির্গমন অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পরিপন্থী হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেখা গেল, ট্রাম্পের শুল্ক হ্রাসের ঘোষণার পর পরই ভারতীয় মুদ্রার মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে যা এখন ৯০ টাকার আশেপাশে এবং সেনসেক্স-নিফটির সূচকও বেড়েছে। এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ভারতীয় বাজারে আর্থিক অনিশ্চয়তা হয়তো কমবে যা বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ মূল্যবৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণে আনবে। 

আমেরিকার এই মত পরিবর্তন আদতে রঘুরাম রাজনের বক্তব্য ও জেপি মরগানের অনুমানকে সঠিক প্রমাণ করেছে। ট্রাম্প-নীতির ফলে মার্কিন অর্থনীতির খুব একটা উন্নতি তো হয়ইনি উপরন্তু অন্যান্য দেশের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্ক ও বাণিজ্য চুক্তি সফল হলে ভারতের বিপুল বাজার আমেরিকা চিরতরে হারাবে-- এই আশঙ্কায় আমেরিকার মত পরিবর্তন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। কিন্তু বিপদের আশঙ্কা অন্যত্র। গত ৬ ফেব্রুয়ারির যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্ট উল্লিখিত আছে যে, আমেরিকা ভারতীয় পণ্যের ওপর ১৮ শতাংশ শুল্ক ধার্য করবে এবং পরিবর্তে ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির ওপর আরোপিত সমস্ত শুল্ক ও অশুল্ক বাধা তুলে নেবে। ফলে, নতুন ঘোষিত চুক্তি অনুসারে ভারত ৫০০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের আমেরিকান জ্বালানি, কৃষি পণ্য, কয়লা এবং অন্যান্য পণ্য কিনবে যা বেশ উদ্বেগজনক। ভারতে আমদানির বাজারের সিংহভাগ আমেরিকার হস্তগত হবে এবং অন্য দেশের সঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তিগুলির ভবিষ্যৎ পড়বে প্রশ্নের মুখে। ইতিমধ্যেই এই চুক্তি ভারতীয় কৃষকদের ক্ষোভের কারণ হয়েছে, যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল ভর্তুকিপ্রাপ্ত কৃষি পণ্য ভারতীয় বাজারকে ছেয়ে ফেলবে। খবরে প্রকাশ, ভারতীয় কৃষক সমাজ বৃহত্তর আন্দোলনের পথে। অবশ্য ট্রাম্প এই হুমকিও দিয়ে রেখেছেন যে ভারত বেশি বেগড়বাই করলে আবারও উচ্চ শুল্ক চাপবে। ভারত যেন খেলার পুতুল। প্রধানমন্ত্রীও নির্বিকার।

২০২৪ সালের সমীক্ষা অনুসারে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কৃষক জনসংখ্যা মাত্র ১৮.৮ লক্ষ এবং কৃষিপণ্যের প্রায় ৩৯ শতাংশ ভর্তুকিপ্রাপ্ত। সবচেয়ে বড় অংশ ভুট্টা, সয়াবিন, গম, তুলা ও ধানের জন্য বরাদ্দকৃত যা ভারতের কৃষি ভর্তুকির তুলনায় অনেক বেশি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ভারতে কৃষি ভর্তুকি কৃষকদের উৎপাদন খরচ লাঘবের জন্য প্রদত্ত এবং ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের মাধ্যমে দামের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সরকার কর্তৃক আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু, ২০১৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কাছে একটি অসত্য অভিযোগ করে WTO'র কৃষি-চুক্তি (AoA) অনুসারে ভারতকে ফসলের উৎপাদন মূল্যের ১০ শতাংশের মধ্যে ভর্তুকিকে সীমাবদ্ধ রাখতে বাধ্য করে। বর্তমানে ভারতে ১৪.৬৫ কোটি কার্যকর কৃষি খামার রয়েছে, ভারতের ৪৮ শতাংশ কর্মশক্তি ও ৬৫ শতাংশ মানুষ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষী। অতএব, নতুন বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়িত হলে তাদের আয় ও জীবিকার মারাত্মক ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলো তাদের নিজ দেশের কৃষকদের স্বার্থে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নিজেদের কৃষিপণ্য ‘ডাম্পিং’ করতে কৃষি-ভর্তুকি ও WTO-র কৃষি-চুক্তিকে (AoA) অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। এছাড়াও, অস্বাস্থ্যকর জিনগত উপায়ে পরিবর্তিত মার্কিন ভুট্টা ও অন্যান্য শস্যের ভারতে বাজার দখলের সম্ভাবনা রয়েছে।

তাই, প্রস্তাবিত ভারত-মার্কিন চুক্তিটি চূড়ান্ত হলে আমেরিকার কাছে তা 'সব চুক্তির সেরা' হলেও সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির চাপে পর্যুদস্ত হয়ে ভারতের কাছে তা ‘Mother of all burdens’ (বা, 'সব বোঝার ভার') হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও যথেষ্ট।


2 comments:

  1. Dr. R Bhattacharyya10 February 2026 at 18:40

    খুব সুন্দর লেখা। অনেক তথ্য সমৃদ্ধ

    ReplyDelete
  2. very interesting and informative. Easy to understand.

    ReplyDelete