Pages

Saturday, 14 February 2026

মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িকতার জয়

ন্যারেটিভ বনাম কর্মসূচির রাজনীতি

শাহেদ শুভো



'বিএনপি এমন একটা নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে চায়, যেখানে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী কিংবা সংশয়বাদী, পাহাড়ে কিংবা সমতলে বসাবসকারী প্রতিটি নাগরিক নিরাপদে থাকবে', বিএনপি চেয়ারম্যান ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই ছিল বক্তব্য। এই বক্তব্য দিয়ে শুরু করলাম, কারণ, তাঁর বক্তব্যের নির্দিষ্ট দুটো শব্দ ‘অবিশ্বাসী' ও 'সংশয়বাদী' ব্যবহার করার মতো সাহস অথবা রাজনীতি কিন্তু শেখ হাসিনারও ছিল না! হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতি করতে মদিনা সনদের আলোকের বাংলাদেশ অথবা মডেল মসজিদ নির্মাণের ধর্মীয় লেবাসে নিজেকে প্রগতিশীল রাজনৈতিক হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন! অথচ তারেক রহমান শুরু থেকেই তাঁর রাজনীতি কী হবে, তা জনগণের সামনে হাজির করেছেন। 

বিএনপি'র উদার, গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদী রাজনীতির মেনিফেস্টোই কি বিএনপি'কে ২১৫ আসনের বিপুল জয় নিশ্চিত করেছে? জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশে ডঃ ইউনুস সাহেবের অন্তর্বর্তী সরকারের সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতা, জামায়াত ইসলাম সহ ইসলামপন্থী শক্তির উত্থানে মদত দান, জনগণের সামনে তৌহিদী জনতার মব ভায়োলেন্স, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু প্রশ্নে জামায়াত ইসলামী কর্তৃক পাকিস্থানপন্থীদের বয়ানকে আবার নতুন করে সামনে হাজির করা, অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র নেতৃত্বের একাংশের ক্ষমতায়নের রাষ্ট্রীয় প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় নানা লুঠপাট দুর্নীতিতে যুক্ত হওয়া, এই ছাত্র নেতৃত্বের প্রচ্ছন্ন অংশগ্রহণে মৌলবাদী রাজনীতির ন্যারেটিভ তৈরি করা, বিভিন্ন ইউটিউব ব্লগারদের ন্যারেটিভ হাজির করা এবং সেই ন্যারেটিভে বিশ্বাসী একটা অংশের ভয়ঙ্কর ঘৃণাবাদী রাজনীতি, যে রাজনীতি জাতীয়তাবাদ-পরিচয়বাদের সমন্বয়ে এক মারাত্মক দিকে মোড় নিয়েছিল। বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভিতর আতঙ্ক তৈরি, শত শত মাজার ভেঙ্গে ফেলা, কোরান-আল্লাহ ও ধর্ম অবমাননার অজুহাতে জ্যান্ত মানুষ পুড়িয়ে মারা অথবা শরীয়ত সম্মত কবরের নামে কোনও মানুষকে কবর থেকে তুলে আগুনে পুড়িয়ে ফেলা, ছায়ানটে উদীচীর মতো প্রতিষ্ঠানে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো, পত্রিকা অফিস পুড়িয়ে দেওয়া, সাংবাদিকদের আটকে রেখে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা-- ইউনুস সাহেবের শাসনামলে বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয় জনগণ এই সব দৃশ্য দেখেছেন আর প্রতিনিয়ত আতঙ্কিত হয়েছেন। কেউ এর পালটা কথা বলতে গেলে তাকে নানারকম ট্যাগ দিয়ে হত্যাযোগ্য করা হচ্ছিল। 'দিল্লি না ঢাকা'-- এই আধিপত্যবাদ বিরোধিতার আড়ালে এক বিশেষ রাজনৈতিক বয়ান হাজির করে রাজনৈতিক প্রপাগান্ডার অংশ বানানো, অথচ, এরাই সাম্রাজ্যবাদীদের নানা চক্রান্ত ও তাদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক 'নন-ডিসক্লোজার' চুক্তি বিষয়ে নীরব ছিল, যখন বন্দর রক্ষায় লড়াই করেছে বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো আর স্থানীয় বন্দরের শ্রমিক নেতারা। 

বাংলাদেশে ভোটের রাজনীতিতে ইসলামপন্থীদের ভোট বৃদ্ধির পুরো কৃতিত্ব এক শ্রেণির ইউটিউবার ও ব্লগারদের। ভবিষ্যতে ভোটের রাজনীতির বিশ্লেষণে আশা করা যায় এই বিষয়টা কেউ যুক্ত করবেন। প্রশ্ন হল, জামায়াত ইসলামের এই যে আশ্চর্যজনক উত্থান ও তাদের ভোট বৃদ্ধি, তা কি ইসলামপন্থীদের বাড়বাড়ন্তের জন্য? উত্তরে বলা যায়, এটা যেমন পুরোপুরি সত্য নয় আবার এও ঠিক যে, এই জাতীয়তাবাদ-পরিচয়বাদের সঙ্গে যুক্ত ঘৃণাবাদ ইসলামপন্থীদের পক্ষেই ভোটের বাক্সে পড়েছে। ফলে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই ভাবতে হবে। বলাই বাহুল্য, সংগঠিত ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো নতুন শক্তি হিসেবে নিজেদের পুনর্গঠিত করতে সক্ষম হয়। পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি, ধর্মীয় ঐক্যের আহ্বান এবং হাসিনা বিরোধী রাজনৈতিক ক্ষোভ— এই তিনকে একত্র করে তারা ভোট ব্যাঙ্ক সম্প্রসারণের চেষ্টা করে। মজার ব্যাপার হল, আওয়ামী লীগ বিহীন নির্বাচন যা অন্তর্বর্তী সরকার, জামায়াত ইসলাম ও এনসিপি (ছাত্র নেতৃত্ব) চেয়েছিল, কারণ, তাদের ইচ্ছে ছিল দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে হাজির হওয়া। সর্বশেষ নির্বাচনে ৬ থেকে ১০ শতাংশ ভোট পাওয়া জামায়াত ইসলাম দলটা জানত, শুধু নিজ শক্তিতে ভোটে গেলে বিরোধী দল হিসেবে তারা উঠে আসতে পারবে না; তাই একদিকে লীগকে ভোট থেকে বিরত রাখা আবার অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ে নিজেদের লীগের বন্ধু হিসেবে পেশ করা, কারণ, বিএনপি'র মতো বৃহত্তম সাংগঠনিক শক্তিকে ঠেকাতে গেলে তৃণমূলে লীগের সহযোগিতা চাই। ওদিকে তৃণমূল স্তরে বহু অসহায় লীগ কর্মী নিজেদের আশ্রয়ের জন্য জামায়াত ইসলামের পক্ষে কাজ করেছে। তদুপরি, এই নির্বাচনে অভ্যুত্থান পরর্বতী বাংলাদেশে জামায়াত নিজেদের অভ্যুত্থানের অন্যতম মালিক হিসেবে দেখাতে পেরেছে, যেখানে অন্যান্য প্রগতিশীল শক্তি, বিএনপি'র ছাত্র সংগঠন, সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের নিজ নিজ ব্যস্ত জীবনযাপনে জড়িয়ে পড়ায় এই ইসলামপন্থী রাজনীতির মূল রাজনৈতিক দল জামায়াত ইসলাম ও তাদের ছাত্র সংগঠন শিবির জুলাই অভ্যুত্থানকে ৭১'এর মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। এইসব বয়ানের মূল উদ্দেশ্য ছিল, ১২ ফেব্রুয়ারি'র নির্বাচনে এই মতাদর্শের অংশকে তাদের দিকে টেনে নেওয়া। আবার বৃহত্তর ইসলামিক ঐক্য বানিয়ে ইসলামী চিন্তার ভোটগুলিকে এক জায়গায় নিয়ে আসার প্রয়াসও তারা করেছে। পরবর্তীতে এনসিপি, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অলি আহমদ, আক্তারুজ্জামানদের যুক্ত করে জেন-জি ও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তির কিছু ভোট তাদের পক্ষে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টাতেও তারা সফল হয়েছে। এখানে এনসিপি রাজনৈতিক ভুল করেছে। তারা যদি একক ভাবে নির্বাচনে লড়ত তাহলে বুঝত তাদের ভোট কত। বরং প্রশ্ন উঠেছে, এই নির্বাচনে এনসিপি বা জেন-জি ভোটাররা কি জামায়াতের ভোটার ছিল? যদিও এ বিষয়ে ভিন্নমত আছে। এক পক্ষ বলছে, জেন-জির ভোট ইসলামপন্থীদের দিকে গেছে, আবার আরেক অংশ বলছে, জেন-জি যারা এনসিপি'কে ভোট দিয়েছে তারা মূলত এনসিপি ছাত্র নেতৃত্বের প্রতি আকর্ষিত হয়েই তা দিয়েছে। 

জামায়াত খুব চমৎকার মেটিকুলাস নির্বাচনী ডিজাইন হাজির করলেও তাদের সফল হওয়ার চেষ্টাকে থামিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের বৃহত্তম শান্তিপ্রিয় মুক্তিযুদ্ধপন্থী অসাম্প্রদায়িক মানুষেরা। জামায়াত ইসলাম ও এনসিপি যেখানে মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার অথবা জুলাই সনদকে মুক্তিযুদ্ধের সমকক্ষ করে একটি ন্যারেটিভ দাঁড় করাতে চাইছিল, সেখানে বিএনপি'র বিরুদ্ধে হাজারও অভিযোগ থাকার পরেও বাংলাদেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর কাছে অন্য কোনও অপশন আর ছিল না। পাশাপাশি, তারেক জিয়ার দীর্ঘ নির্বাসিত জীবনের পর ফ্যাসিস্ট হাসিনাবিহীন বাংলাদেশে তাঁর প্রত্যাবর্তন ও মার্টিন লুথার কিং'এর 'আই হ্যাভ এ ড্রিম'এর আদলে 'আই হ্যাভ এ প্ল্যান' তিনি জনপরিসরে হাজির করলেন এবং তাঁর কর্মসূচি ভিত্তিক রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা, সকল সম্প্রদায়ের প্রতি ধর্মীয় স্বাধীনতার আশ্বাস বাংলাদেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর কাছে তাঁর প্রতি যে আস্থা তৈরি করল তা বিএনপি'র এই বিপুল জয় দেখেই বোঝা যায়। এই নির্বাচন হয়ে উঠল ন্যারেটিভ বনাম কর্মসূচির নির্বাচন। জামায়তের জোট ও তার প্রপাগান্ডিস্ট ব্লগার'রা যখন পরিচয়বাদ এবং ঘৃণা ও নারী বিদ্বেষের রাজনীতি হাজির করল, তার বিপরীতে বিএনপি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন, সামাজিক নিরাপত্তা, বৃক্ষ রোপণের মতো ইস্যুতে জনগণের সামনে পরিপূর্ণ এক রাজনৈতিক ইশতেহার নিয়ে এল। এই বিজয় যতখানি না বিএনপি'র তার চেয়ে বেশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, ভিন্ন মতাদর্শের মানুষ, শহুরে প্রগতিশীল অংশ, গ্রামের বস্ত্রশিল্পের সাধারণ কর্মজীবী নারী, মুক্তিযোদ্ধা, কোথাও আওয়ামী লীগের প্রগতিশীল অংশের (যারা বিএনপির পক্ষে ভোট দিয়েছে)। অন্যদিকে, জেন-জি আর পেরি আর্বান নারীদের একটা বিশাল অংশ জামায়তকে ভোট দিয়েছে ইনসাফ ও জান্নাতের আশায়।

বাংলাদেশের এই নির্বাচন কার্যত মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষের জয়। এই জয় ভবিষ্যৎ'কে নিশ্চিত সুশাসন, গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতাকে শক্তিশালী করবে। মব প্রপাগান্ডিস্ট ব্লগারদের বিরুদ্ধেও এই জয় এক তীব্র প্রতিবাদ। রাজনীতির ন্যারেটিভ কত ভয়ঙ্কর ও আতঙ্কদায়ক হতে পারে তা বাংলাদেশের নির্বাচনে ধারণা করা গেছে। বিএনপি-সরকার গঠন হবার পর এই মিথ্যা প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে লড়াই জারি রাখতে হবে, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পালন করা আর সুশাসনের ব্যবস্থা করলেই এই ধর্মান্ধ অংশ ব্যালট লড়াইয়ে পিছিয়ে যাবে। আর আওয়ামী লীগকে ফিরে আসতে হবে জুলাই অভ্যুথানে তাদের দ্বারা সংঘটিত নৃশংস অপরাধকে কবুল করে ও মাফ চেয়ে। তবেই বাংলাদেশে রাজনৈতিক ভারসাম্য দেখা যাবে। রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রতিযোগিতামূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র অপরিহার্য। এই নির্বাচন তাই কেবল সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই নির্বাচন আওয়ামী লীগের ভোটারবিহীন নির্বাচনের বিরুদ্ধে প্রথম পদক্ষেপ যেখানে বাংলাদেশ জিতেছে। বাংলাদেশের এই সংসদীয় নির্বাচনের সঙ্গে রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্দেশ্য একটি 'হ্যাঁ'/ 'না' গণভোট হয়েছে যেখানে 'হ্যাঁ' বিপুল ভাবে জয়যুক্ত হয়েছে। এটি কেবল প্রশাসনিক সংস্কারের প্রশ্ন নয়, বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ চরিত্র নিয়ে জনগণের অবস্থান স্পষ্ট করার একটি রাজনৈতিক মুহূর্ত। সংসদীয় রাজনীতির বাইরে জনগণের সরাসরি মতামতকে রাষ্ট্র কাঠামোর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করাটা সাব্যস্ত করছে যে, বাংলাদেশে এখনও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা জীবিত। নির্বাচিত সরকার যদি এই গণরায়ের তাৎপর্য বুঝে সংস্কার, জবাবদিহিতা ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এগোয়, তবে নির্বাচন ও গণভোট মিলেই এক নতুন রাজনৈতিক ভারসাম্যের ভিত্তি তৈরি হতে পারে। 

এ নিয়ে খুব শিগগির লিখব আশাকরি।


3 comments:

  1. ভালো লাগলো লেখকের বিশ্লেষণ!

    ReplyDelete
  2. চমৎকার রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

    ReplyDelete
  3. গনহত্যাকারীদের দ্রুত বিচার করতে হবে।

    ReplyDelete